DjM Originals

ঠাকুর – তাপস সাঁতরা

ভিডিও কলে অফিসের মিটিং শেষ করে ফেসবুকটা অন্ করতেই একটি পোস্ট সমস্ত দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিল। লকডাউনের জেরে অধিকাংশ মানুষ যেহেতু ঘরবন্দি তাই ওই পোস্টে একটি ফেসবুক পেজের পক্ষ থেকে সদস্যদের কাছে আবেদন করা হয়েছে বাড়িতে থেকে রবি ঠাকুরের কবিতা, গান অথবা রবীন্দ্রসঙ্গীতের সাথে নৃত্য পরিবেশন করে ভিডিও আকারে পাঠানোর জন্য। পোস্টটি পড়ে তমালের প্রথম রবি ঠাকুরের সঙ্গে পরিচিতি হওয়ার কথা মনে পড়ে গেল।

সেই বছর সে প্রথম স্কুলে ভর্তি হয়েছে। বেশ কয়েক দিন ধরে শুনছে ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন উপলক্ষে স্কুল অনুষ্ঠান হবে। বড় দাদা, দিদিরা বিভিন্ন রকম প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছে এমনকি তার নিজের ক্লাসের কয়েক জনও দিয়েছে। তমাল নিজে অংশগ্রহণ না করলেও ওই দিনটির অপেক্ষায় সেও প্রহর গুনছিল। অবশেষে এল সেই দিন ২৫শে বৈশাখ। ভোরে উঠে স্নান করে, ফুল তুলে স্কুলের উদ্দেশ্য রওনা দিল। কয়েক দিন আগে বিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজো হয়েছিল তখন পুরোহিত এসেছিল;কাসর, ঘন্টা, ঢাক বেজেছিল। তমাল সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে খুব মজা করেছিল এবং সঙ্গে ছিল খিচুড়ি খাওয়া। স্বাভাবিকভাবেই তার ধারণা ছিল ওই রকম কিছুই হবে ‘ঠাকুর’ যেহেতু। কিন্তু একি কোথায় পুরোহিত, কোথায় কাসর, ঘন্টা ঢাক এমনকি খিচুড়িও নেই। শুধু দাড়ি ওয়ালা বুড়োর ছবিতে ফুল, মালা দিয়ে সাজানো। মনটা খারাপ হয়ে গেল। মাঝখানে কবিতা আবৃত্তি, গান ও নৃত্য দেখতে দেখতে কিছু ক্ষণের জন্য সবকিছু ভুলে গিয়ে ছিল কিন্তু সবশেষ হতেই মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল সরস্বতী পুজোর মতো আজকেও যা আশা করেছিল তার কিছুই না পেয়ে। বাড়ি এসে মা কে সব অভিযোগ জানাতে মা হেসে বলেছিলেন ‘ওরে বোকা, রবি ঠাকুর ছিলেন একজন জ্যান্ত মানুষ, মূর্তির দেবতা নয়। যার লেখা কবিতা, গান, উপন্যাস, গল্প আমাদের প্রতিদিনের চলার শক্তি যোগায়।’ তখন ওই সব কথা কিছুই মাথায় ঢোকেনি।

বড় হতে হতে রবীন্দ্রনাথকে একটু একটু করে জেনেছে। রবীন্দ্র সঙ্গীত ও নৃত্য দুটোই শিখেছিল একসময়। তখন রবি ঠাকুর তার আত্মার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। কিন্তু কালের নিয়মে, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে এখন রবি ঠাকুরের সঙ্গে আত্মার সেই টান অনেকটাই শিথিল হয়ে গেছে।

তমাল ভাবছিল একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে ভিডিও করে পাঠাবে। কিন্তু কোনটা গাইবে ঠিক করে উঠতে পারছে না। সকালে চা খেতে খেতে টিভিটা চালু করে নিউজ চ্যানেলটা লাগাতেই দেখল বিশাখাপত্তনমের ভাইজাকে এল.জি কোম্পানির পলিমার কারখানা থেকে স্টাইরিন গ্যাস নির্গত হওয়ার ফলে কয়েকজন মানুষ মারাগেছেন এবং অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন। নিউজটি দেখে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। নিজের অজান্তেই গুন গুন করে উঠল –

“অকারণে অকালে মোর পড়ল যখন ডাক

তখন আমি ছিলেম শয়ন পাতি।

বিশ্ব তখন তারার আলোয় দাঁড়ায়ে নির্বাক,

ধরায় তখন তিমিরগহন রাতি।……. “

Leave a Comment

x