জলপরী – আরতি চৌধুরী | JOLPORI by Arati Choudhury

জলপরী – আরতি চৌধুরী | JOLPORI by Arati Choudhury

পারুল কয়েকদিন থেকেই হতাশায় আচ্ছন্ন ছিল ।একদিন বাদে 27 বছরের দরজায় কড়া নেড়ে ভিতরে ঢুকবে অথচ জীবনে যেন কিছুই পাওয়া হলো না । জীবনের ব্যালেন্স শিট টা কিছুতেই মিলাতে পারছে না। চাকরি পাওয়া টা হলো অ্যাসেট আর বিয়েটা হলো লাইবেলিটি । পারুলের হাসি পেল। আমাদের অ্যাসেট থাকলেই হয় না!সঙ্গে সঙ্গে লিয়াবিলিটি টা চাই কেন? অন্তর থেকে কে যেন বলে উঠলো -এ প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে নেই, তুমি কি দিতে পারবে পারুল!

গঙ্গার থেকে বেশি দূরে নয় ওদের বাড়ি। অনবরত লোক আসে এই গঙ্গার ঘাটে। পারুল সুমিতার সঙ্গে প্রায় রোজই আসতো ছোটবেলা থেকে। কতো হাসি মজার কথা হতো । বছর পাঁচেক হলো সুমিতার বিয়ে হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম যোগাযোগ ছিল। সুমিতা বেড়াতে এলে সারাদিন দুজনে গল্প করতে করতে কখন যে বেলা গড়িয়ে যেত তার হিসাব রাখত না। বিয়ের পর সুমিতা যতবার ওদের বাড়ি এসেছে ততোবারই মা বলতেন ,” দেখিস তো সুমিতা পারুলের জন্য যদি কোন পাত্রের সন্ধান পাস নাকি। ওকে যদি পাত্রস্থ করতে পারতাম তবে শান্তি পেতাম ।”

প্রতিবারই মায়ের এই দৈন্যতার জন্য খুব খারাপ লাগতো পারুলের।এই জন্য মায়ের উপর কয়েকদিন খুব ক্ষ্যাপা হয়ে থাকতো। মায়ের সঙ্গে রাগ করলে মা বলতেন, “আমি যে মা, মা হলে বুঝবি।”পারুল ভাবতো মা হয়ে তারপর বুঝার দায়িত্বটাও ওরই!আজ পারুল আজ অনেকদিন পর গঙ্গার ঘাটে এসে বসেছে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল গঙ্গার বয়ে যাওয়া স্রোতের দিকে। কত লোক পারাপার হচ্ছে। নদীর ওই পার থেকে রেপটিং করার জন্য ভিড় জমেছে। বুঝাই যাচ্ছে এপার থেকে। একটা বার তের বছরের ছেলে রং বেরঙের বেলুন নিয়ে ঘুরাঘুরি করছে বিক্রি করার আশায় ।

পারুলের আজকাল যেন কি হয়েছে ।একই সাথে হাজারো চিন্তা ওর মাথায় ঢুকতে চায়। কে কার আগে ঢুকতে পারে তারই যেন প্রতিযোগিতা । সামনেই একটা 4/5 বছরের ছেলে বেলুন কেনার জন্য মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। ওর মা বেলুন কিনে দিবে না কিছুতেই আর বেলুন ছাড়া বাচ্চাটা যাবে না কিছুতেই। কি রহস্যময় বুঝ অবুঝের খেলা । পারুল অনেকক্ষণ ধরে এই খেলাটাই দেখছিল । অবশেষে ও নিজেই একটা বেলুন কিনে বাচ্চাটার হাতে দিয়ে ওর মাকে বলল,” আপনার আপত্তি নেই তো ?” ছেলেটা বেলুন নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে কোথায় উধাও হয়ে গেল ।ওর মাও একটু হেসে চলে গেল ।বোধহয় ওর মায়ের কাছে টাকা ছিল না ।সব সময় তো সবাই টাকা নিয়ে বের হয়না।

পারুল এখন এখনো মাঝে মাঝে সুমিতাদের বাড়িতে যায় সুমিতার মাকে দেখতে। একদিন সুমিতার মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পারুল কে বলেছিল, “জানিস পারুল ,সুমিতাকে সেই কবে থেকে দেখি না! এখন আর ওর আসার সময় হয়না। সংসারের কত চাপ যে! আরও দু’বছর পরে যদি দিয়ে দিতাম!” পারুল কি বলবে ভেবে পায়না। ওর মায়ের দুঃখ বিয়ে দিতে পারছে না বলে আর সুমিতার মায়ের দুঃখ সুমিতাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিল বলে। হায়রে পৃথিবী! এ কোন গোরখ ধাঁধায় মানুষ ঘুরছে! পারুল হাত ঘড়িটার দিকে তাকালো। সবে মাত্র সাড়ে 5 টা বাজে। এখনই বাড়ি ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা নেই ।এই নদীতে ছোটবেলা কতো সাঁতার কেটেছে সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পাঠ কবেই চুকে গিয়েছে। পারুল সাঁতার টা ভালোই শিখেছিল । নদীটার সঙ্গে ওর আত্মীয়তা হয়ে গিয়েছিল। দুদিন না আসলেই মন উথাল পাথাল করতো ।

পারুলের মনে পড়ে গেল একটা ঘটনার কথা। নদীর চর পরা অংশে নেট টানিয়ে কয়েকজন ছেলে ভলিবল খেলছিল ।হঠাৎ ভলিবলটা গড়িয়ে নদীর স্রোতে ভেসে যেতে লাগলো ।পারুল এক ঝাঁপ দিয়ে দূরে চলে যাওয়া ভলিবলটা এনে দিয়েছিল ছেলেগুলোকে। সেদিন একটা ছেলে ওকে “জলপরী ” বলে ডেকেছিলো। পারুল লজ্জায় ভিজে কাপড়ে এক দৌড়ে বাড়ি চলে গিয়েছিল ।কয়েকদিন পরে যখন গঙ্গার ঘাটে এসেছিল তখন সেই ভলিবল খেলার ছেলেগুলোকে আর দেখতে পায়নি। পারুল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। যে ওকে জলপরী বলে ডেকেছিল তার দিকে একবার মাত্র মুখ তুলে তাকিয়ে ছিল। ওই বলটা পারুলের হাতের থেকে ওই নিয়েছিল। এক পলকের দেখা চেহারাটা আজও ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে যখন ও গঙ্গার ঘাটে আসে ।এত বছরেও কেন পারুল ওই চেহারাটা ভুলতে পারল না। জীবনের কত ঘটনাই তো ভুলে গেছে।এমনকি কাল ওর মা ঘরে ফেরার সময় দুধ নিয়ে যেতে বলেছিল তাও ও ভুলে গিয়েছিল। কেন এমন হয় ? এ প্রশ্নের উত্তর পারুলের কাছেও নেই।জগতের কারো কাছেই বোধহয় নেই। পারুল ভাবতে-ভাবতে কোথায় কোন জগতে চলে গিয়েছিল ।

এখন গঙ্গার হাওয়াটা একটু শীতল শীতল লাগছে। হঠাৎ চোখে পড়ল মাঝ নদীতে রেফটিং করতে করতে একটা নৌকো পালটি খেয়েছে। এইরে! পারুল চিৎকার করে উঠল। কাছাকাছি কোনো গাইড নেই। ও কোনো চিন্তা না করেই এক ঝাঁপ দিয়ে প্রাণপণে সাঁতরিয়ে নৌকার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলো ।ও যতই তাড়াতাড়ি নৌকার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, নৌকাটা ততই দূরে চলে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত নৌকাটা ধরতে পেরেছে। তখনো দুটো ছেলে নৌকাটা ধরে রয়েছিল। পারুল দেখতে পেল আরেকটা ছেলে অনেকটা দূরে ভেসে চলে যাচ্ছে। পারুল সাঁতরিয়ে ছেলেটাকে ধরল। নদীর স্রোত এর থেকে অনেক চেষ্টায় ছেলেটাকে নিয়ে পারে পৌঁছলো। ততক্ষনে ছেলেটা অজ্ঞান হয়ে গেছে

গাইড ও অন্যান্য লোকজন এসে গেছে। ডাক্তার এসে পরাতে প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। পারুলের ভিজে জামা কাপড় গায়েই শুকিয়ে গেছে। সেদিকেও খেয়াল নেই ।ছেলেটাকে যে শেষপর্যন্ত বাঁচাতে পেরেছে এই ভেবেই শান্তি পেল। পারুল চলে যাচ্ছিল । এমন সময় শুনতে পেল ছেলেটা অস্ফুট স্বরে ডাকছে “জলপরী “। পারুল চমকে উঠলো। ওইতো সেই জলপরী নাম দেওয়া ছেলেটা। পারুলের পাদুটি অবেশ হয়ে যাচ্ছিল। আর এক পাও এগোতে পারছে না। এমন সময় ভিড়ের মধ্য থেকে কে যেন বলে উঠল “তুমি ওকে তোমাদের বাড়ি নিয়ে যাও। সুস্থ হলে বাড়ি পাঠিয়ে দিও। তুমিই তো ওকে নতুন জীবন দিয়েছো।”পারুল কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। “এ কেমন ঘটনা ঈশ্বর !” ও শুধু বলল, একটা গাড়ি ডেকে দিন।

All copyright reserved goes to Arati Choudhury

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *