গল্প: ভালোবাসার রং – নীতা গাঙ্গুলি । Story Valobashar Rong by Nita Ganguly

সুনীলবাবুর আজকাল মনটা একদম ভালো নেই।
শরীরটাও যেন খারাপ লাগছে। যদিও প্রেসার আর সুগার ছাড়া বিশেষ কোনো অসুখ এখনো পর্যন্ত দেখা যায়নি।
কেন ? আর বলবেন না। ওই যে মল্লিকার সাথে ঝগড়া একদম বন্ধ। কফির কাপে যদি ঝড়ই না উঠলো তবে আর পয়সা খরচা করে কফি খাওয়ার কি
দরকার ? লাল চা ই তো আছে, সংসারেও একটু সাশ্রয় হয়।

ধুর ধুর জীবনটা একদম পানসে হয়ে গেছে।
এত বছরের অভ্যাস প্রতিদিন অফিস থেকে এসে কফি খাওয়া থেকে শুরু করে রাতে খেতে বসে কিছু একটা নিয়ে বচসা , ফলস্বরূপ বেশ খানিকটা রাগারাগি। তারপর রাগ ভাঙ্গানো এবং প্রেমে ভেসে যাওয়া।এগুলো কি কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ?

আরে তাতেই তো খাবারটা ভালোভাবে হজম হয় ফলে শরীরটাও একদম ফিট।

এখন তো ঝগড়া করার জন্য কারণ খুঁজতে হয়, তারপরেও ভাবতে হয় এটায় কি ঝগড়া হবে ? মল্লিকা তো আজকাল যা উদাসীন হয়ে গেছে, ঝগড়া করতেই চায় না। সারাক্ষণ খালি ফোনের মধ্যে কি সব লিখছে আর পোস্ট করছে। অবশ্য লেখাগুলো মন্দ হয় না, উনি লুকিয়ে লুকিয়ে সবই পড়েন।

আগে যখন মোবাইল ছিল না দিনগুলো কি আনন্দেরই না ছিল।
ওনার শনিবার ছুটি থাকতো, তবে মল্লিকার অফিস ছিল হাফ ডে। ওর ফিরতে তিনটে বেজে যেত। উনি অপেক্ষা করতেন , মল্লিকা ফিরলে একসাথে ভাত খেতেন। কোনো কোনো দিনতো খেতে খেতেই ঝগড়া শুরু হয়ে যেত। তারপর আর কি একে অপরের রাগ ভাঙানোর খেলা। তখন আবার কোল্ড কফি করে রাগ ভাঙাতে হতো।

তারপর টিভি দেখা নিয়ে ঝগড়া?
উনি খবর দেখবেন তো বউ সিনেমা দেখবে।এরপর তো আবার ছেলের কার্টুন। শেষে সবাই মিলে রাগ করে টিভি বন্ধ করে দিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পরা।

ফোন তো একটা বাড়িতে ছিল, টেবিলে বসানো। তাতে তো শুধুই কথা বলা তাও আবার খরচ সাপেক্ষ।

আর এখন এই হোয়াটসআপ, ম্যাসেঞ্জার, টুইটার _ তুমি তোমার সময় মতো কথা বলো সে তার সময়মতো শুনবে । যেন অনেকটা সেই ছোটবেলার চিঠি পাঠানোর মতো।

উনিও হাল ছাড়বার লোক নন। তবে কিনা ছেলেটা বড় গেছে তাই একটু ভেবে চিনতেই কাজ করতে হয়। ছোটবেলায় মা-বাবাকে এত ঝগড়া করতে দেখেছে, ভালোবাসাটা তো
আর দেখতে পায়নি।
কথা কাটাকাটি শুরু হলেই ধমক_ ” তোমরা থামবে? সারাক্ষণ খালি নার্সারির বাচ্ছাদের মতো ঝগড়া করছে। ওঠোতো, যাও দুজনে দু ঘরে গিয়ে বসো।”

তবে এবার সত্যি সত্যিই ঝগড়া করার সুযোগ এসে গেলো।

ছেলে এবছরই সবে ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হয়েছে। এখনই কলেজ থেকে এক্সকারসনে নিয়ে যাবে? মল্লিকা তো একদমই রাজি না।ছেলে এসে বাবাকে ধরলো। এইবেলা বাবা? সারাক্ষণ তো খালি মা মা করছে।
“ঊনিশ বছরের ছেলে আবার এইটুকু কি?
হ্যাঁ, তুই যাবি। টাকাপয়সা কি লাগবে আমাকে জানিয়ে দিস।”_ বলে সদর্পে ঘরে ঢুকে
গেলেন।

মল্লিকা কিছুই বললনা। খেতে বসে কার কি লাগবে তাও জানতে চাইলো না। যাইহোক ঘরে বেশ একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। এটাই বা কম কি?

ছেলেকে তুলে দিয়ে এসে মোবাইলটা নিয়ে বিছানায় বেশ একটু গুছিয়ে বসেছেন। ফেস বুকে লাইকগুলো দিচ্ছেন, দুদিন সময় হয়নি অনেক জমে গেছে। নয় নয় করে ওনারও তো বন্ধু সংখ্যা বেশ ভালোই।

“আমার যদি এবাড়িতে কোনো সম্মানই না থাকে তাহলে থাকার কি দরকার?”_ কোমরে হাত দিয়ে তিনি সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
একটু যেন পুরোনো সুর ফিরে আসছে মনে হচ্ছে।
“না থাকলেই হয়।”_ মোবাইলে চোখ রেখেই বললেন।
“কি বললে? এত বছর সংসার করার পর এই পুরস্কার?
আওয়াজটা যেন একটু বেড়েছে মনে হচ্ছে? হোক হোক, এটাই তো চাই।

“বলবেই তো।এখন তো আমি পুরোনো হয়ে গেছি। নতুন নতুন সব সুন্দরী বান্ধবী জুটেছে। সারাক্ষণ তো শুধু মোবাইলে চিপকে আছো। বুঝিনা ভেবেছো? সবই বুঝি কিন্তু আত্মসম্মান খোয়াব না বলে কিছুই বলিনা।”

“তা তুমি কোন মোবাইল ছাড়া সারাক্ষণ থাকো শুনি? “

“আমার মোবাইল নিয়ে একদম খোঁটা দেবে না বলছি। আমি তোমার মত সারাক্ষণ ফ্লার্ট করিনা।গল্প লিখি।”

” কি এমন লেখক, জানালা দিয়ে উঁকি দিলে এমন লেখক না ঘরে ঘরে দেখতে পাওয়া
যাবে।”_ একটু জোরেই বললেন।

” কি বললে? আমি বের করছি তোমার লাইক দেওয়া”_ বলেই একদম ঝাঁপিয়ে ওনার বুকে।
শুধু এটুকুরই তো অপেক্ষা ছিল।
ব্যাস একদম চেপে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট।
আর বাকিটা? ব্রহ্মা জানেন।

মল্লিকা ঘুমিয়ে পড়লে আস্তে করে উঠে আগে জানালার পর্দাগুলো টানটান করে দিলেন , সকালে যাতে রোদ না আসে, তারপর শত্রু দুটোকে সুইচ অফ করে মল্লিকার আলমারির লকারে ঢুকিয়ে দিলেন,
তার আগে অবশ্য ছেলেকে একটা ম্যাসেজ করে দিলেন, কাল একটা ইম্পরট্যান্ট মিটিং আছে সারাদিন ব্যস্ত থাকব। তোমার মা খুব রেগে আছেন , ওনাকে ফোন করার দরকার নেই, আমি রাতে তোমার সাথে কথা বলবো। আরো দুটো জরুরী ম্যাসেজও করে দিলেন।

“এই শুনছো? ” _ কতদিন পরে শুনলেন,
মনটা একদম ভরে গেল।
মটকা মেরে শুয়ে রইলেন।
“আরে ওঠো না। ফোনটা পাচ্ছি না ।” _ যেই না ধাক্কা দিয়েছে অমনি টেনে বিছানায়।
” ছাড়ো ছাড়ো, অনেক বেলা হয়ে গেছে।কি করে সময়ে অফিস পৌঁছাব কিছুই বুঝতে পারছি না। আর উনি এখানে রোম্যান্স করছেন।
তোমার ফোন থেকে একটা রিং করো তো। কাল তোমার জ্বালায় ফোনটা যে কোথায় রাখলাম!”

“অফিস যাবে না তো আজ।”
“মানে?” এমন না জানিয়ে ছুটি নেওয়া যায় নাকি?”
” জানানো হয়ে গেছে।
আজ আমরা সারাদিন ঘুরবো, সিনেমা দেখবো ,খাবো, তারপর বাড়ি এসে….💔….”
“বুড়ো বয়েসে যত ঢঙ। “
“দেখবে বুড়ো না জোয়ান? “
“না না। কাল অনেক দেখেছি আর শখ নেই”।

“তাহলে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। ফ্লুরিসে
ব্রেকফাস্ট করে রক্সি তে লাভ আজকাল। তারপর ভাবছি সেই কলেজ লাইফের মতো একবার কফি হাউসে বসে তোমার সাথে ঝগড়া করবো। তারপর ঠিক করবো তোমায় নিয়ে আর কি কি করা যায়।”

মল্লিকা স্নানঘরে ঢুকলে ব্যাগ থেকে তাড়াতাড়ি করে হলুদ জামদানি আর মেজেন্টা কালারের লিপস্টিকটা বের করে বিছানায় রেখে উনিও স্নান করতে চলে গেলেন।

অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশি সময় নিয়েই স্নান করলেন। সাজার জন্য একটু সময় দিলেন। প্রায় লেখাতেই হলুদ জামদানির কথা থাকে মনে হয় পছন্দ। আর ওই কালারের লিপস্টিক অনেক খুঁজেছিলো পায়নি , তারপরে বোধহয় ভুলেই গেছে। নিজে থেকে তো কিছু চাইবে না কোনদিন।খুব খুশি হবে।

সন্ধ্যেবেলায় কফি হাউসে বসে কফি খেতে
খেতে_ “বিয়ের আগে শেষ যেদিন আমরা দেখা করেছিলাম , এরকমই সারাদিন কাটিয়েছিলাম মনে আছে তোমার?। তখন তো আর মুঠোফোনের জীবন ছিল না, চাইলেও দেখা সম্ভব ছিল না।
হা পিত্যেস করে সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করতে
হতো।”
“হ্যাঁ, তুমি সেদিনও হলুদ পোশাক পড়েছিলে।
তুমি কিন্তু তখন যেমন সুন্দরী ছিলে এখনো তেমনই আছো”।
“ওটা তো ভালোবাসার রং।”
জানো একেক সময় মনে হয় যদি এই
দৌড়ঝাঁপের জীবন থেকে মাঝে মাঝে ছুটি নেওয়া যেতো !”……..
💓💓💓💓💓💓💓💓💓💓💓💓

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x