গল্প: উপস্থিতি – শওকত নূর । Uposthiti by Saokat Nur

আমার উপস্থিতিতে তাদের বিচলিত হবার কোনও লক্ষণ ফুটে উঠল না। আমিই বিচলিত হলাম উল্টো, এই ভেবে যে এ বাড়ির খোলা আঙিনায় এমন আসর একান্ত নজিরবিহীন ঘটনা। গান বাজনায় এ বাড়ির কেউ কোন কালে ছিল না তা নয়, তবে ভৃত্য সকল ব্যতিরেকে বড়সড় আসর জমানোর মতো কোন ঘটনা এই প্রথম। কারা গাইছেন এতসব মনোহর ভারি যন্ত্রপাতিতে, এমন সুরেলা কণ্ঠে? কেউ তানপুরা নিয়ে স্থির বসে, কারো মুখে বাঁশি, কারো কাঁধে বেহালা, হাতে মৃদঙ্গ সরাজ, কারো বা আঙ্গুল সেতার -তবলা ও হারমনিয়ামে। আমারই বাড়ি অথচ আমিই যেন অতিথি। তাদের এতটা ঘেষে পা চালিয়ে আঙিনা পেরিয়ে বারান্দায় উঠে এলাম, কেউ চোখ মেলে চাইলেন না পর্যন্ত। সঙ্গীতে এতটাই মত্ত তারা! অবশ্য মত্ততা না এলে এমন সুর সৃষ্টি সম্ভব নয়। শরীর কেমন শিউরে যাচ্ছে- পার্থিব জগতে অনেকের সুরই আমাকে ভীষণ টেনেছে, আজও টানে, কিন্তু এমন অপার্থিব মূর্ছনা! বারান্দায় নিস্পন্দ দাঁড়িয়ে দেয়ালে পিঠ লেপ্টে তন্ময় হয়ে রইলাম। কোন গানটা চলছে এখন ? সুর ও কথাগুলো কি আমার চেনা ? না, চেনা নয়, তবে চেনা জানার কাছাকাছি এমন গান যে আছে দু একটি, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। একে সরাসরি গান বলা চলে না। এটি মূলত একটি রাগ, সুরস্রষ্টা তানসেনের এমন একটি পরিবেশনা অডিওতে কোনও সময়ে শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সূর মূর্ছনায় কেমন ডুবে আছে গোটা পরিসর। আমি ছাড়া কোন জনমানব নেই। গাছের মাথাগুলো স্থির, ডালে ডালে সব পাখি নিরব, নিশ্চুপ। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম পরিবেশনাটি শেষের অপেক্ষায়। যার কণ্ঠ চড়ছে তার দিকেই নিবদ্ধ আমার দৃষ্টি, আমার দু কান, সমস্ত মনোযোগ। সাদাসিধে পোশাক তার গায়ে – পাঞ্জাবির ওপর কটি, মাথায় সঙ্গিতি বিশেষ টুপি। পরিবেশনা থেমে এলে যন্ত্রগুলো এক এক করে নিভতে থাকে। সব শেষ যন্ত্রটি স্তব্ধ হলে ধীরে ধীরে চোখ খোলেন পরিবেশক, চারদিকে নজর ঘোরাতে থাকেন। ঘৃর্ণায়মান দৃষ্টিটি বারান্দায় উঠে এলে আমি তাতে আমূল বন্দী হই। একি দেখছি ? এমন বিস্ফারিত কেন হল সঙ্গীতপুরুষের চোখ ? শুধু তারই নয়। একে একে সব চোখ ঘুরে এসে বিস্ফারিত নিপতিত হল আমার ওপর।অকস্মাৎ উঠে দাঁড়ালেন কণ্ঠ সঞ্চালক। তাকে অনুসরণ করলেন অন্যরা। কী অনুরাগে হন হন করে হাঁটা ধরলেন সঞ্চালক। তার পেছন পেছন স্ব স্ব যন্ত্র হাতে-কাঁধে মৌণ হেঁটে আঙিনা পেরিয়ে দেউরি পথে বেরিয়ে গেলেন পুরোটা দল। এবারে কী এক অচেনা অনুভব মুহূর্তে দুর্বার নাড়িয়ে দেয় আমাকে। ভেতরে প্রশ্ন তোলপাড়- আমারই কোনও অনিচ্ছাকৃত ভুলে কি ক্ষোভে দুঃখে এমন হন্তদন্ত উঠে গেলেন পুরোটা দল ? এমন অপার্থিব সম্মোহনকারী সুরলহরীটা থেমে গেল! কী একটা চিৎকার অজান্তে বেরিয়ে যায় কণ্ঠ থেকে। তখনই ঘরের ভেতরে উচ্চারিত হয় বাবার শান্ত শীতল কণ্ঠ , সুকর্ণ।

জি বাবা।

কী ভাবছিস তন্ময় হয়ে ? ওনারা কেন অমন উঠে গেলেন, তাই ?

জি বাবা, কেন উঠে গেলেন ওনারা ? কী এমন —?

তোর কি সুর সাধক সুরতাজ উল্লাহ মাস্টার সাহেবের কথা মনে পড়ে ? নিভৃতচারী সেই সুরসাধক! ওই যে কাছারির দরজা জানালা বন্ধ করে একান্তে গলা সাধতেন যিনি ?

না বাবা, কিছু মনে পড়ে না। নামও শুনিনি এমন।

ও তাইতো। তুই কেন তাকে চিনতে যাবি? সে তো আমার শৈশবকালের কথা।

কী সে কথা, বাবা ?

ওই তো ওই সুরতাজ উল্লাহ মাস্টার সাহেব। জায়গির ছিলেন এ বাড়িতে, দূর দেশের মানুষ। পাশের গাঁয়ের স্কুলে মাস্টারি করতেন। শুধুই সুর সাধনায় মত্ত থাকতেন অবসরে। তবে নিভৃতে। ঘর ভর্তি যন্ত্রপাতি ছিল। সাধতেন সেসব। একটা সময় মাস্টারি ছেড়ে সঙ্গীতেই চলে গেলেন। বড় বড় সব জলসায় যেতেন।

বাবা, তারপর ?

জলসা করলেও সুর সাধনাটা তার নিভৃতেই হতো। শুধু যন্ত্রীরা যন্ত্র বাজাতো একান্তে। এক সময় মস্ত জনপ্রিয় হয়ে ছেড়ে গেলেন আমাদের। যাক সেসব। এতদিন পর বাড়ি এলি, বল কী খেতে মন চায় তোর। হাটে যাবো- মাছ নিয়েই যতো সংশয়ে পড়ি। কারণ, এর তো আর রকমফেরের অভাব নেই। কত যে বিচিত্র ধরণ এ প্রজাতির! বল কী মাছ তোর খেতে মন চায়।

বাবা, মাছে আর কী এমন পছন্দক্রম দেবো বলো। সব মাছই তো খাই আমি জানো।

তবু এতদিন পর আজ বাড়ি এলি। খেলেও সব মাছ তো আর সমান স্বাদের নয়। তোর কি সেই কাউনিয়া মাছের কথা মনে পড়ে ? ওই যে কাচা হলুদের মতো গাঢ় হলদে রঙ যে মাছটার। ওই যে গায়ে যার কাঁটা বিঁধে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলি তুই। কোলে করে আমি বাড়ি নিয়ে আসি।

বাবা, মনে পড়ছে না তেমন কিছু। কবে কাঁটা বিঁধল পায়ে?

আহা পাগল ছেলে, কাকে তুই কী বলছিস ? ওই মাছের কাঁটা বিঁধে অজ্ঞান তো হয়েছিলি তুই ছেলেবেলায়। তোকে কাঁধে করে বাড়ি এনেছিলাম আমি। সেই কথা তুই চাপাচ্ছিস সুকর্ণর উপর। স্মৃতি এমনই গেল যে নিজের শৈশব চাপিয়ে দিলি ছেলের ওপর। তা দাদুভাই, ওকে বলে দাও তুমি এ মাছটাই আনতে। আমিও মনে মনে ভাবি, কতদিন খাওয়া হয় না এই মাছ! দেখিই না সেই কোনকাল থেকে!

কোত্থেকে দাদা হাজির হয়ে একটানে বললেন এ কথাগুলো।

ঠিক আছে বাবা, দাদাও যখন বলছেন তবে এ মাছটাই এনো। ভালই হবে নিশ্চয়ই।আমি বললাম।

আমি যাই তবে হাটে। কই গেলিরে তোরা সব? বাবা কণ্ঠ উঁচালেন।

আহা, একটু দাঁড়া না। কতদিন পর শহর থেকে বাড়ি এল আমার প্রাণের নাতিটা। শুধু মাছ নিয়ে ফিরলেই কি চলে? তা দাদু ভাই, তোমার কি সেই মিছরির ঘোড়া, চমচম, রসগোল্লা, সন্দেশ, জিলাপি, বাতাসা, খাজা, গজা, বাদামটানা, চানাচুর, বিরেন ঘোষের খাসা দইয়ের কথা মনে পড়ে? হাটবারের কথা?

হ্যাঁ হ্যাঁ দাদাভাই, খুব মনে পড়ে। প্রতিদিন মনে পড়ে। হাটবারে কত কিছুই তো নিয়ে ফিরতে তুমি ! বারান্দায় আমরা অধির হয়ে বসে থাকতাম তোমার ফেরার অপেক্ষায়। ভৃত্যরা ঝাঁকা ভর্তি জিনিসপত্র নিয়ে ফিরত। তোমার হাতে ঝুলত একজোড়া এই বড় ইলিশ। দেউরিতে পা দিয়ে কত আদরেই না তুমি আমাদেরকে ডেকে উঠতে। ঘিরে ধরতাম আমরা তোমাকে।কারণ,আমাদের সবচে পছন্দের মহাস্বাদের সন্দেশের প্যাকেটটি থাকতো তোমার পাঞ্জাবির পকেটে। সব মনে আছে।

বল তাহলে তোর বাবাকে হাট থেকে যেন এসবেরও কতগুলো নিয়ে তবেই ও ফেরে।

শুনলে তো বাবা, দাদাভাই কতকিছুর কথা বললেন?

হ্যারে, যাই তবে জলদি। সকাল সকাল হাটে না গেলে ভাল জিনিস জুটে না। বিশেষ করে ওই কাউনিয়া মাছ।

বাবা ভৃত্যদের নিয়ে তড়িঘড়ি হাটে চলে যান। মা এসে দরজায় দাঁড়ান। এতক্ষণ গোসলে ছিলেন মা। আঁচলে কপালের ঘাম মুছে বললেন, এই গরমে পাগলের মতো দাঁড়িয়ে রইলি, বাবা। আয় বোস, শরবতটা খা। লম্বা গাছটার পাকা আমগুলো আজ সকালেই পাড়া হয়েছে, দক্ষিণের গাছের কাঁঠাল, প্রথম পেকেছে। জানিস তো এ গাছে চৈত্র শেষেই কাঁঠাল পুষ্ট হয়ে পাক ধরে। এখন তো ভর বৈশাখ।

কথার ফাঁকে মা কান পাতেন। বাড়ির পেছন দিকটা থেকে বিশেষ শব্দ ভেসে আসছে। দুবার হল শব্দটি, কুক্লিক, কুক্লিক। বললাম, মা, কানাকুয়া ডাকছে?

বাবা, পাখির ডাক ভুলে গেলি ? এতো হাঁড়িচাচা পাখি, কুটুম পাখিও বলে মানুষ। কানাকুয়ারা তো বলে পুত পুত। এখন আর শুনি না সেই ডাক। কানাকুয়া ডাকে না, ডাহুক ডাকে না, বৌড়ি, বাজ পাখির ডাক নাই, হুতোম পেঁচার ডাকও শুনি না আজকাল। মাঝে মাঝে এই হাঁড়িচাচাটা ডাকে। পেছন দিকের আতা গাছটাতে কয়টা আতা দেখেছি রাঙা হয়েছে। একটা বড় পেপেও পাক ধরেছে। এজন্যই এই ডাকাডাকি। যাই নিয়ে আসি তোর জন্য। আঙুরির মা টা যে কই গেল ?

মা বেরিয়ে গেলেন। ফল পাড়াবেন কাউকে দিয়ে। ডাকাডাকি করছেন। এরই মধ্যে আবারও দাদা এলেন। লাঠি ঠুকে ঘরে ঢুকে তাঁকের ওপরকার পাতিলগুলোর ঢাকনা তুলে বলতে লাগলেন, রান্নাবাড়ার কী করল তোর জন্য ? তোর কি সেই জুম্মাবারের কথা মনে আছে ?

হ্যাঁ, দাদাভাই। খুব মনে আছে। ওই যে তুমি কদমা বাতাসা আনতে প্রতি জুম্মাবারে।

গোশত দেওয়া খিচুড়ির কথা?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাও মনে আছে। এখনও কি সেসব দেয়?

হ্যাঁ, কতজন সিন্নি বিলায় ! বড় বড় ডেচকিতে করে নিয়া আসে। এখন আর বাড়ি পর্যন্ত আনি না। পথেই গরিব মানুষদের বিলাইয়া আসি। তোরা সব বাড়িছাড়া সেই কত বছর! কার জন্য আনব ? যাই, গোসলের সময় হইল। তুই যা। বিকালে সব খেত খোলাগুলান তোরে দেখাইয়া আনব। খুব ভাল ধান হইছে খেতে খেতে। এখন অবশ্য অতো বেশি রকমের ধান নাই। সব খেতেই চিকন ধানের দুইটা মাত্র জাত।

দাদা লাঠি ঠুকে বেরিয়ে গেলে মা ঘরে ঢোকেন। সাথে গামলা ভর্তি পাকা আতা, পাকা পেঁপে। এক এক করে সব খোসা ছাড়িয়ে প্লেট ভরে দিতে থাকেন। খাওয়ার জন্য হাত বাড়াতে যাবো, এরই মধ্যে আকাশ থেকে গুড়ুব গুড়ুব ডাক ভেসে এলো। থমকে মুখ তুলে খোলা দরজা জানালায় দৃষ্টি উড়িয়ে দিলাম বাইরে।

এ বাবা, কী ঘন নীলচে মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ! ঝড় আসবে বুঝি। বৈশাখী ঝড়। মা বললেন, বাবা, তোর কি সেই ছেলেবেলার আকাশ মনে পড়ে ?

হ্যাঁ মা, খুব মনে পড়ে। ওই তো সেই আকাশ। বৈশাখে এমন ঘন নীল মেঘে ছেয়ে উঠলে তুমি সব সময়ই বলতে কাকের ডিমের মতো মেঘ। ওই তো সেই মেঘ।

তা বাবা, বিমান নিয়ে কত দেশ বিদেশে যাস। সহজে বাড়ি আসার ছুটি পাস না। যখন বিমান চালাস এ বাড়ির উপর দিয়ে কি কখনো চালিয়ে যাস ? ওপর থেকে কি দেখতে পাস এ বাড়ি ?

মা, হয়তো যাই এ বাড়ির ওপর দিয়ে। দেখাটা তেমন হয়ে ওঠে না।

এরপর যখন যাবি চোখ নামিয়ে একটু দেখে যাবি বাড়িটা। নিজেদের বাড়ি, বাপ দাদার ভিটা।

হ্যাঁ মা, হ্যাঁ, এরপর থেকে তাই দেখব।

আমি বিমান চালাচ্ছি। ঢাকা থেকে থিম্পু। মাত্রই ঘোষণা দিলামঃ শুভ মধ্যাহ্ন, যাত্রীগন! আমি ক্যাপ্টেন মাহতাব সুকর্ন বলছি।—–। ……. ডিগ্রী দ্রাঘিমাংশে ………….. ডিগ্রী অক্ষাংশ …….., মিটার উচ্চতায় —– কি.মি. বেগে চলছে আমাদের বিমান। —

আগে থেকেই টার্মিনাল থেকে বাড়ির দূরত্ব পরিমাপটা করে রেখেছি। বিমান ছেড়ে দেয়ার পূর্বাহ্ন থেকে ভাবছি, আজ নিচে উঁকি দিয়ে বাড়িটা নিশ্চয়ই দেখে নেব। সহজে যাওয়া হয়ে ওঠে না, অথচ পৈতৃক ভিটেবাড়ি। টার্মিনাল থেকে ওপরে উঠে কিছুক্ষণ পরই দেখতে পাই আকাশে ঝড়োমেঘ। সেই কাকের ডিমের মতো ঘন নীল মেঘের পাহাড়! আমাদের ঠিক বাড়িটার ওপর বরাবর দক্ষিণ পশ্চিম উত্তরে। আমি যাচ্ছি উত্তরে। মেঘগুলো এমন তাক লাগিয়ে দিচ্ছে চোখে! দেখতে দেখতে মনে হল বাড়িটা অতিক্রম করে যাচ্ছি। ঠিক নিচেই দাঁড়িয়ে আছে উঁচু উঁচু সব তাল, নারিকেল, সুপারি, ইউক্যালিপটাস, দেবদাড়ুর গাছ। দেখার জন্য গলা বাড়িয়ে দিতেই টের পেলাম যান্ত্রিক গোলোযোগে রাডারচ্যুত, পথচ্যুত হয়ে ভয়াল বিভীষিকাময় শব্দে নিচে ছিটকে পড়তে যাচ্ছে আমার বিমান! বিকট চিৎকার দিয়ে উঠি।

ঘুম ভাঙার পর চোখ বুজে ভাবছি। স্বপ্ন আর বাস্তবের ঋতু বৈপরীত্যের নির্দেশক হয়ে শিশিরের টুপটাপ শব্দ ভেসে আসছে কানে। এরপরও দুঃস্বপ্নের ঘোর পুরোটা কাটেনি। শরীর কাঁপছে মৃদু, পিঠে টের পাচ্ছি ঘামে বিছানা ভিজে গেছে। পাশ ফিরে শুতেই ঘরের বাইর থেকে ডাক ভেসে এল, সুকর্ণ। দুঃস্বপ্ন দেখছো ? প্রতিবেশি নওরোজ ভাই।

হুম। অস্ফুট বললাম আমি।

ভয় পাইয়া থাকলে উঠো। বাইরে একটু হাটাহাঁটি করো। নইলে খারাপ লাগবে। যাই, কোন সমস্যা হইলে আমারে জোরে ডাক দিও।

নওরোজ ভাই চলে গেলে ধীরে ধীরে খাট থেকে উঠে দরজা খুলে বারান্দায় আসি। মাত্রই পশ্চিমাকাশে চাঁদ ডুবেছে। চারদিকে আবছা অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘর দুয়ার, গাছপালা; আকাশের মৌনমুখ দেখতে পাচ্ছি। পাঁচ ছ’টি ঘর বড়পরিসর আঙিনা ঘিরে। সবগুলোতে তালা ঝুলানো। আমি ছাড়া এ বাড়িতে কেউ নেই। রাতে অনেক দিন পর এসে একাই শৈশব কৈশোর কাটানো ঘরটিতে ঘুমিয়েছি। যতক্ষণ ঘুমে ছিলাম পুরোটাই নানাবিধ স্বপ্নে কেটেছে। সবটাই মধুর, শুধু শেষেরটা বাদে। এত বছর ধরে বিমান চালাই। কোনদিন তো দেখি না এমন দূর্ঘটনা দুঃস্বপ্ন। আজ কেন দেখলাম এমন বিভিষিকা দৃশ্য? ভাবতে ভাবতে আনমনে নেমে যাই বারান্দা থেকে। হেঁটে আঙিনা পেরোতে থাকি। স্বপ্নে যে জায়গাটাতে গানের আসর বসেছিল, সেখানে একটা ভাঙা পুরনো বাঁশি পড়ে আছে, একটা শিশুখেলনা প্লাস্টিক দোতারা,একটা ছেঁড়া শতরঞ্চি। আঙিনা ছাড়িয়ে চলে আসি বার গেটের তালা খুলে বাইরে।

ওই তো বড় দুটো পালান। উঁচু উঁচু কী ফসল তাতে ? একেবারে কাছে চলে এসে হামাগুড়িতে একে একে দেখি- দামানো ঘন মটরকলাইর গাছ, আরেকটিতে ফুলেল সরিষা। পৌষ শীতে হালকা হালকা কুয়াশা পড়েছে। এমন শীত রাতে যখন পূর্ণিমার জোছনা থাকত, কৈশোর যৌবনে কী বিস্ময়েই না দেখতাম এমনই ঘন সবুজ কলাইর কিংবা হলুদ সরিষায় পূর্ণ এ খেত দুটিকে। মাঝে মাঝে মনে হতো যেন অপার্থিব কোনও জগৎ ! নিজেকে হারিয়ে দিতাম সে অপার্থিবতায়।

খেতের আল ধরে, আম বাগানের সারিবদ্ধ যতো গাছের গা ঘেষে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি পারিবারিক কবরস্থানে। ওই তো সারিবদ্ধ সব কবর-দাদার, দাদীর, বাবার, মায়ের, —–।

স্থির দাঁড়িয়ে যাই। এতক্ষণ দেখা স্বপ্নদৃশ্যগুলো একে একে উঁকি দিতে থাকে মনের নিভৃত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x