স্পর্শ না পাওয়া উপাধি - সৌরভ কর্মকার

গল্প: স্পর্শ না পাওয়া উপাধি – সৌরভ কর্মকার | Sparsho na Paoa Upadhi by Sourav Karmakar

খুব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলাম। চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরছিলাম খুব অপরাধী একজন পুরুষ হিসেবে পরিবারের কাছে আর আত্মীয়স্বজনদের কাছে অকর্মের ঢেকি শরীরটি নিয়ে মাথা নীচু করে দিন কাটানোর সময়টি শুরু হয়ে গিয়েছে। টাকাপয়সার অভাব তো ছিলোই, সাথে সাথে মনবলের অভাবও শুরু হয়ে গিয়েছে। আত্মবিশ্বাস উঠে দাঁড় করানোর মতো ক্ষমতা প্রায় শেষ। আমার অসুবিধা জেনে শান্তনা দেওয়ার পরিবর্তে মনের অসুস্থতা বাড়িয়ে দিচ্ছিলো পাড়ার কিছু কিছু কুচুটে সাংবাদিকেরা। 
মন সুস্থ রাখার জন্য কিছু তো একটা করতেই হবে সেই চেষ্টায় আমি তার সাথে নিয়মিত কথা বলতে লাগলাম। অত্যন্ত কথা বলা ছেলেটি(আমি) তাকে কথায় কথায় হাসানোর চেষ্টা করতাম যাতে –
 আমার উপর তার আগ্রহ কোনোদিনও যাতে কমে না যায়,
নতুন কাউকে পেলে আমাকে ভুলে না যায়,
তার মন খারাপ হলে আমার হাসির কথাগুলো যাতে খারাপ মনের মেরামত করে দেয়,
যাতে এমন একটা মানুষের অস্তিত্বের অভাব তাকে পেতে না হয় যে সর্বদা তার মুখে হাসির আওয়াজ শুনতে চায়,
এমন একটা মানুষের সংস্পর্শে আছে যে তাকে দ্বিতীয় গুরুত্ব দেয়,
এমন একটা মানুষ যে প্রিয় বন্ধু রূপে রয়ে থাকবে।ফোনের মাধ্যমে প্রতিদিন তার সাথে ম্যাসেজে তো কথা হয়ই আর ফোন কলের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় সবচেয়ে বেশিবার কথা তার সাথেই হয়। আমার বাড়ির সবাই ভাবে আমি প্রেম করি তার সাথে।
আমাকে খোঁচা মেরে বলে “বউমা জোগাড় করে ফেললি ব্যাটা! দাঁড়া তোর বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি”! 
আমি বুঝিয়ে উঠতে পারতাম না যে সে আমার প্রেমিকা নয়। 
 জামাকাপড়ের দোকানে গিয়েছিলাম মায়ের সাথে। পাশে একটা মহিলাকে দোকানদার শাড়ি দেখাচ্ছিলো ভিন্ন ধরনের। আমার মনে শুধু ভাবনা আসতে লাগলো
  “যদি এই শাড়িটি সে পড়ে তাকে স্বয়ং লক্ষ্মী’র মতো লাগবে, ওই শাড়িটি পড়লে তাকে স্বনির্ভর নারীর মতো লাগবে, নীল শাড়িটি পড়লে অধ্যক্ষের মতো লাগবে আর যদি বেনারসি শাড়ি পড়ানো হয় মাথায় যদি সিঁদুর পড়ানো হয় তাকে ‘বিয়ের পিড়িতে বসে থাকা পার্বতীর মতো লাগবে’ আর যদি হলুদ চুড়িদারটি পড়ে বসে থাকে আর আমি তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকি ; ঘনঘন খিলখিল হাসি দিতে থাকে তাহলে তো আমি পাগলা হয়ে যাবো”।
     ” তার উপর ভালোবাসার স্রোতটি প্রবল বেগে     আসছিল”।তাকে জানিয়েছিলাম আমি তাকে ভালোবাসি প্রচন্ড তাকে বিয়ে করতে চাই। তার উত্তর ছিলো 
“আমার পক্ষে হয়তো সম্ভব হবে না, সে দুরে। বহু বহু দুরে। পরিবার থেকে এতো দুরে সংসার করা অসম্ভব। আমাকে কেন ভালোবাসো আর কেনই বা আমাকে বিয়ে করতে চাও?”

স্পর্শ না পাওয়া উপাধি - সৌরভ কর্মকার
স্পর্শ না পাওয়া উপাধি – সৌরভ কর্মকার


আমি বললাম ” আমাকে তোমার যতোটা খেয়াল করো ততোটা খেয়াল আমার বন্ধুরাও করে না, মনের গভীরে ঢুকে মনের সংস্পর্শে অন্য কেউ আসতে চাইবে না, তুমি আমার মতো ভাবো কখনও কখনও আর আমার পক্ষে তুমি আমার স্ত্রী যথাযথরূপে”। 
এক কথায় বলতে গেলে আমার উপর প্রেমিকের অনুভূতি আর জীবনসঙ্গী অনুভূতিটা তার আসবে না সে নিশ্চিত ছিলো।
সে বলেছিলো “চলো এমন একটা সম্পর্ক স্থাপন করি যেটা প্রেমিক-প্রেমিকা, প্রিয় বন্ধু-বান্ধবীর সম্পর্কও হার মেনে যাবে”।
তার এই কথাটি আমার প্রচন্ড ভালো লেগেছে। বহু মাস বলে আসা কথা
“তোমাকে খুব ভালোবাসি কিন্তু বন্ধু হিসেবে” কথাটির চেয়ে তো অনেক ভালো কথা শুনে ফেললাম। আমার দাঁত ভ্যাটকানো যেন কমছিলোই না।
  তার খেয়াল রাখার চেষ্টা করতাম, তাকে শাসন করার চেষ্টা করতাম। তার সেরকম বন্ধু বান্ধবী নেই, কথা বলার মতো, তার খোঁজ খবর নেওয়ার মতো দুজনই আছে মোট। একজন আমি আর অন্যজনটি হলো একটি ছেলে যে কলকাতায় থাকে। আমার শুধু একটা ভয় হয় আমার বদলে যদি সেই ছেলেটি তার জীবনসঙ্গী হয়ে যায়!
 তাকে বলি না কখনও কিন্তু মাঝে মাঝে ওই ছেলেটির কথা মনে পড়লে জ্বলে যাই। একদা আমি লেপের ভীতরে লুকিয়ে তার ফটো দেখছিলাম। লেপের ফাঁকে রাতের অন্ধকারে আলো জ্বলতে দেখে মা লেপ টেনে তুলে দেয় আর ধরা পড়ে যাই। মা এতোদিন জানতো আমি তার সাথে কথা বলি কিন্তু তার ফটো দেখাতাম না লজ্জাতে। সেইদিন আমার ফোন কেড়ে ফটো দেখছিলো। 
   লকডাউনের সময়কালীন গৃহবন্দী অবস্থায় যখন সবাই জীবন নিয়ে চিন্তিত তখন তার জ্বর এসেছিলো। তাদের ওখানে সমস্ত মানুষ হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছিলো, তার জ্বর, গলা ব্যথা, গা ব্যথা, দুর্বল ভাব ওষুধ খেয়ে কমছিলো না। হাসপাতাল ছিলো তার বাড়ি থেকে দুরে আর সেরকম পরিস্থিতি ছিলো না যে হাসপাতালে পোঁছাতে পারবে। সে অসুস্থতা আমি এতো দুর থেকে তার কাছে গিয়ে ওষুধ ডাক্তার পৌঁছে দিতে পারছি না। আমার পুরো দেহ-মন ছটফট করছিলো আমি চোখ ছলছল করছিলো। আমাদের এলাকার সমস্ত ফার্মেসি গুলোতে গিয়ে যোগাযোগ করতে লাগলাম যাতে কোনো ডাক্তারের সন্ধান পেলে তার চিকিৎসা এখান থেকে করিয়ে দেবো। কিন্তু তখন কোনো ডাক্তার করোনার ভয়ে ফার্মেসিতে চিকিৎসার জন্য আসছিলো না। হন্যের মতো বাড়িতে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন খুঁজেও সাহায্যের আলো পেলাম না। চোখ থেকে জল বেড়িয়ে এসেছিলো। ফোনের দিকে তাকিয়ে তার ফটো দেখতে দেখতে কাঁদছিলাম। হঠাৎ খেয়াল আসলো আমার কাছে তো ফোন আছে।  তৎক্ষণাৎ  ইন্টারনেট এর সাহায্যে ডাক্তার ম্যাডামের সাথে কথা বলে ওষুধপাতির নাম তাকে পাঠিয়ে দিলাম। সে সুস্থ হয়ে গেলো। অশ্রুভরা নদীতে ভাঁটা চলছিলো, তার সুস্থতার সংবাদ খুশির জোয়ার এনে দিলো।
আমার সম্পূর্ণ প্রতিটি হৃদস্পন্দনে  তারই নাম লেখা আছে। তার চোখে জল, শরীর অসুস্থতা এইসব আমার হৃদপিন্ডের শিরা-ধমনী ছিঁড়ে ফেলে। 
সে মানুষটিই “স্পর্শ না পাওয়া উপাধি” মাত্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x